June 12, 2026, 6:42 pm
জাতীয় বাজেট ২০২৬–২৭-এ উচ্চ প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বিস্তার এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের নানা উদ্যোগ থাকলেও এর বাস্তবায়ন সক্ষমতা, রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং ঋণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
শুক্রবার রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত “জাতীয় বাজেট ২০২৬–২৭: সিপিডির পর্যালোচনা” শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও সাংবাদিকদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত আলোচনায় এসব বিষয় উঠে আসে।
অনুষ্ঠানে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তাফিজুর রহমানসহ সংস্থাটির গবেষকরা বাজেটের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করেন এবং সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন।
রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নিয়ে বড় প্রশ্ন
ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের অন্যতম প্রধান প্রশ্ন ছিল—সরকার যে উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, তার বাস্তব উৎস কী?
সাংবাদিকরা উল্লেখ করেন, গত এক দশকে বাংলাদেশের রাজস্ব প্রবৃদ্ধি কখনোই খুব বেশি ছিল না। অথচ নতুন বাজেটে প্রায় ১৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, সরকার কীভাবে এই অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় করবে।
এ বিষয়ে সিপিডি বলেছে, বাজেটে রাজস্ব বাড়ানোর জন্য কর প্রশাসনের ডিজিটালাইজেশন, কর ফাঁকি কমানো এবং কর অব্যাহতি হ্রাসের মতো কিছু উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের ফল এক বছরের মধ্যে পাওয়া কঠিন। কারণ কর সংস্কার ও প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য সময় প্রয়োজন।
ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাজেটে যেসব কর সুবিধা ও বিনিয়োগ প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর সুফল পেতে সময় লাগবে। বিনিয়োগ বাড়বে, উৎপাদন বাড়বে, আয় বাড়বে—তারপর সেখান থেকে অতিরিক্ত রাজস্ব আসবে। ফলে এক অর্থবছরের মধ্যেই উল্লেখযোগ্য রাজস্ব বৃদ্ধির আশা বাস্তবসম্মত নয়।
ভিত্তিগত অর্থনৈতিক পূর্বাভাস নিয়ে আপত্তি
সিপিডির সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা ছিল বাজেটের ভিত্তিগত অর্থনৈতিক অনুমান বা বেইসলাইন।
তাদের মতে, চলতি অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে হঠাৎ বড় ধরনের উন্নতি হবে—এমন ধারণার ওপর ভিত্তি করে আগামী অর্থবছরের বাজেট তৈরি করা হয়েছে।
ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, রপ্তানি, আমদানি, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ, মূল্যস্ফীতি এবং রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে যে পূর্বাভাস ধরা হয়েছে, তার সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে।
তার ভাষায়, “বাজেটের লক্ষ্য অর্জনের আগে ভিত্তিটাই বাস্তবসম্মত হওয়া দরকার। ভিত্তি যদি দুর্বল হয়, তাহলে পুরো বাজেট বাস্তবায়ন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।”
বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ, কিন্তু গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কী হবে?ফ
সাংবাদিকরা প্রশ্ন তোলেন, বাজেটে বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য নানা কর ছাড় ও প্রণোদনা দেওয়া হলেও শিল্প খাতের মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধান ছাড়া এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে।
তারা উল্লেখ করেন, দেশের বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলে এখনও গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট রয়েছে। অনেক শিল্পাঞ্চলে পর্যাপ্ত অবকাঠামো নেই। এমন পরিস্থিতিতে কেবল কর ছাড় দিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
সিপিডি বলেছে, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির জন্য কর প্রণোদনার পাশাপাশি অবকাঠামোগত সক্ষমতা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক দক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে।
তারা মনে করে, ব্যবসা সহজীকরণে সরকারের কিছু উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও এগুলোর কার্যকারিতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে চ্যালেঞ্জ
ব্রিফিংয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়েও ব্যাপক আলোচনা হয়।
সাংবাদিকরা বলেন, দেশে দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। এমন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন খাতে কর ছাড়, ভর্তুকি ও সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
সিপিডি জানায়, মূল্যস্ফীতি কমানোর লক্ষ্য প্রশংসনীয় হলেও বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় তা অর্জন সহজ হবে না।
বিশেষ করে ব্যাংক ঋণের সুদের হার, বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতি, জ্বালানি ব্যয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার মূল্যস্ফীতিকে প্রভাবিত করবে।
কর্মসংস্থান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ
ব্রিফিংয়ে কর্মসংস্থানকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
সাংবাদিকরা বলেন, একদিকে নতুন বিনিয়োগ কমছে, অন্যদিকে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটছে। তৈরি পোশাক খাতেও কর্মী ছাঁটাইয়ের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
সিপিডি জানায়, তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি আশানুরূপ নয়। একই সঙ্গে যুব বেকারত্বের হারও উদ্বেগজনক।
সংস্থাটি মনে করে, বাজেটে কর্মসংস্থানমুখী কিছু উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অতীতে যে দুর্বলতা দেখা গেছে, তা কাটিয়ে ওঠা না গেলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) অবস্থান
ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকরা অভিযোগ করেন, বাজেটে বড় ব্যবসায়ীদের জন্য বেশি সুবিধা দেওয়া হয়েছে, অথচ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
বিশেষ করে ট্রেড লাইসেন্স, ব্যাংক হিসাব ও কর শনাক্তকরণ সংক্রান্ত কিছু বাধ্যবাধকতার কারণে ছোট উদ্যোক্তারা সমস্যায় পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
তবে সিপিডি বলেছে, বাজেটে এসএমই খাতের জন্যও কিছু সুবিধা রাখা হয়েছে। রপ্তানির সুযোগ বৃদ্ধি, অর্থায়ন সহায়তা এবং বিভিন্ন তহবিলের মাধ্যমে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তা করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিশেষ নজর না দিলে এই খাত কাঙ্ক্ষিত সুবিধা নাও পেতে পারে।
ঋণনির্ভর বাজেট নিয়ে সতর্কবার্তা
বাজেটে বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ ঋণের বড় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ নিয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন তোলেন, বিদেশি ঋণ প্রত্যাশামতো না এলে সরকার কী করবে এবং অতিরিক্ত ঋণ অর্থনীতিতে কী ধরনের চাপ তৈরি করবে।
সিপিডি বলেছে, ঋণের পরিমাণের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা।
ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশকে জাপান বা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা যাবে না। কারণ উন্নত দেশগুলোর অর্থনৈতিক কাঠামো, উৎপাদন সক্ষমতা এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষমতা বাংলাদেশের চেয়ে ভিন্ন।
তিনি বলেন, “ঋণ নেওয়া সমস্যা নয়, সমস্যা হলো সেই ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা। বর্তমানে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ দ্রুত বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে রিজার্ভের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।”
কালো টাকা সাদা করার সুযোগের সমালোচনা
কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
সিপিডি আবারও তাদের পুরোনো অবস্থান তুলে ধরে জানায়, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর নয়, নৈতিকভাবেও গ্রহণযোগ্য নয় এবং রাজনৈতিকভাবেও নেতিবাচক বার্তা দেয়।
তাদের মতে, এতে সৎ করদাতারা নিরুৎসাহিত হন এবং কর সংস্কৃতির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে।
আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার গুরুত্ব
বিনিয়োগ পরিবেশের প্রসঙ্গে সাংবাদিকরা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার বিষয়ও উত্থাপন করেন।
সিপিডি মনে করে, বিনিয়োগ আকর্ষণে কর ছাড় বা প্রণোদনা যথেষ্ট নয়। ব্যবসা পরিচালনার জন্য স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ, নিরাপত্তা এবং সুশাসন নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সিপিডির সার্বিক মূল্যায়ন
সিপিডির মতে, বাজেটটি জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্য সামনে রেখে তৈরি করা হয়েছে। এতে প্রবৃদ্ধি, সামাজিক সুরক্ষা, পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন এবং বিনিয়োগ উৎসাহের নানা উপাদান রয়েছে।
তবে বাজেটের সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়ন সক্ষমতা, প্রশাসনিক সংস্কার, জবাবদিহিতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার ওপর।
সংস্থাটি মনে করে, বাজেটের নীতিগত দিকগুলো অনেকাংশে ইতিবাচক হলেও বাস্তব অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিকল্পনা, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার ছাড়া নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে।
“বাজেটের মূল চ্যালেঞ্জ এখন আর পরিকল্পনায় নয়, বাস্তবায়নে”—সিপিডির পর্যালোচনার কেন্দ্রীয় বার্তা ছিল এমনটাই।
Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.